৬৭। সূরা আল মূলক (সার্বভৌম কর্তৃত্ব)

 সূরার শুরুতেই আল্লাহ সকল ক্ষেত্রে তাঁর সার্বভৌম কর্তৃত্ব এর কথা ঘোষনা করেছেন।     

২য় আয়াতের ‘যিনি মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন’ এই কথাটি হতে বোঝা যায় যে, মৃত্যু আলাদা একটি সৃষ্টি; শুধুমাত্র জীবনের অনুপস্থিতিই মৃত্যু নয়। এছাড়া আরো বোঝা যায় যে, যিনি মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন তিনি অবশ্যই মৃত্যু থেকে মুক্ত, অর্থাৎ মৃত্যু তাঁর উপর কার্যকর হতে পারে না।    

আয়াত ৩ এবং ৪ এ ৭ টি আসমানে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে আল্লাহর সৃষ্টির নৈপূন্য এর কথা বলা হয়েছে এবং কোন খুত/অসংগতি আছে কিনা তা খুজতে বলা হয়েছে। একবার নয় বরং আরো একবার (বারবার) খুজে দেখতে বলা হয়েছে। কারন ১ম বার মানুষ অবাক হয়ে কোন কিছু দেখে। তখন কোন ভুল ত্রুটি, অসঙ্গতি চোখে পড়ে না। ২য় বার বা বারবার ভাল করে দেখলে ভুল ধরা পড়ে। তাই ১ম অবাক দৃষ্টির পর ২য় অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিয়েও খুত/অসংগতি খুজতে আমন্ত্রন জানানো হয়েছে। আল্লাহ সারা জীবনের জন্য সকলের নিকট ওপেন চ্যালেঞ্জ দিয়ে রেখেছেন যে, যতবারই দেখা হোক না কেন কোন অসঙ্গতি ধরা পড়বে না।       

যারা এই খুত ধরার চ্যালেঞ্জ গ্রহন করে আল্লাহর সৃষ্টিকে আন্ডার এস্টিমেট করে এগুতে থাকে এমন যুক্তিবাদী অবিশ্বাসীরা তো বটেই; বিশ্বাসীরাও তাঁর নিখুঁত, নির্ভুল সৃষ্টি দেখে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে নিজের ক্ষুদ্রতা প্রকাশ করে ক্লান্ত, অপমানিত ও পরাজিত হয়ে হাল ছেড়ে দেয়।      

৪র্থ আয়াতের শেষে ‘হাসীর’ শব্দ দ্বারা মাথার পাগড়ী বা অন্য কিছু যা গৌরবের প্রকাশক তা খুলে ফেলা বুঝায়। অর্থাৎ এর দ্বারা অহংকার, গর্ব শেষ হয়ে যাওয়া প্রকাশ করে।      

এরপর ৫ম আয়াতে ক্লান্ত ও পরাজিত দৃষ্টি দিয়ে ঐ দূরের ৭ আসমানসমূহ নয় বরং সবচেয়ে কাছের আসমানের সৃষ্টির নৈপূন্য দেখার কথা বলা হয়েছে।   

এ আয়াতে আল্লাহ বলছেনঃ “আমি তোমাদের কাছের আসমানকে প্রদীপমালায় সজ্জিত করেছি। আর সে(প্রদীপ) গুলোকে শয়তানদের মেরে তাড়ানোর উপকরণ বানিয়ে দিয়েছি। এসব শয়তানের জন্য আমি প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি"।      

এই আসমানকে প্রদীপ দ্বারা যেমন সৌন্দর্য্য মন্ডিত করা হয়েছে তেমনি এগুলোকে আক্রমনের মাধ্যমও করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর এই সৃষ্টির মধ্যে একই সাথে সৌন্দর্য্যের কোমলতা যেমন রয়েছে তেমনি আক্রমনের কঠোরতাও রয়েছে। কি অসাধারন আল্লাহর সৃষ্টি!!       

১৫ নং আয়াতের শুরুর দিকে আল্লাহ বলছেনঃ "তিনি তো সেই যিনি ভূপৃষ্ঠকে তোমাদের জন্য (গৃহপালিত পশুর ন্যায়) অনুগত করে দিয়েছেন"৷     

‘জালুল’ বলা হয় ঐ সকল গৃহপালিত পশুদেরকে (যেমন উট, ঘোড়া, গাধা, গরু ইত্যাদি) যাদের পিঠ বাঁকা হয় বোঝা এর কারনে। আল্লাহ এখানে ভূপৃষ্ঠকে গৃহপালিত পশুর ন্যায় অনুগত করে দিয়েছেন বলে বর্ননা করেছেন৷ এর দ্বারা কতগুলো বিষয় বোঝা যায়ঃ ভূপৃষ্ঠ আমাদের সাথে অশান্ত, পাগলাটে পশুর মত আচরন করে না, শান্ত আচরন করে, পৃথিবী স্থির নয় বরং পশুর মত চলতে পারে, আমরা ভূপৃষ্ঠের উপর বোঝা স্বরুপ।      

এর পরের অংশে আল্লাহ বলছেনঃ “তোমরা এর (ভূপৃষ্ঠ) ওপর চলাফেরা করো এবং আল্লাহর দেয়া রিযিক খাও৷ তোমাদেরকে তার কাছেই ফিরে যেতে হবে”।    

পশুর পিঠে মানুষ মুসাফির হয়ে চলে, সবসময় অবস্থান করে না। তেমনি ভূপৃষ্ঠে মানুষ জীবিত অবস্থায় চলা-ফেরা করে। গন্তব্য এসে গেলে যেমন পশু থেকে নেমে পড়ে; তেমনি মারা গেলে মানুষ আর ভূপৃষ্ঠে থাকে না।      

আল্লাহ চলাচলের জন্য আল কুরআনে কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন সূরায়। ৬৭ নং সূরা আল মূলক এর  ১৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে "হাটো", এটা মূলত রিযিক অন্বেষণের জন্য অল্প গতির চলাচল। ৬২ নং সূরা আল জুমুয়া এর  ৯ নং আয়াতে নামাজে যাওয়ার ক্ষেত্রেঃ  “ধাবিত হও” বলা হয়েছে যা আরেকটু বেশি গতির চলাচল। 

৩ নং সূরা আলে ইমরান এর  ১৩৩ নং আয়াতে জান্নাত  লাভের  ক্ষেত্রেঃ “পাল্লা দিয়ে দৌড়াও” বলা হয়েছে যা আরো বেশি গতির চলাচল। ৫১ নং সূরা আয যারিয়াত এর  ৫০ নং আয়াতে আল্লাহর দিকে  চলার  ক্ষেত্রেঃ  “ছুটে চলো” বলা হয়েছে যা আগের সকল গতির বেশি গতির চলাচল।  এভাবে আল্লাহ গুরুত্ব ও লক্ষ্য এর বিবেচনায় চলার গতি বাড়াতে বলেছেন খুব সুন্দরভাবে। সুবহানাল্লহ।  

সূরা আল মূলককে মোটা দাগে ৬ টি অংশে ভাগ করা যায়। ১ম অংশ (আয়াত ১-৪) তে আল্লাহর ক্ষমতা বর্ননা করা হয়েছে এবং শেষ অংশে (আয়াত ২৮-৩০) আল্লাহর ক্ষমতায় তুলনায় আমাদের দূর্বলতা প্রকাশ করা হয়েছে। ২য় অংশে (আয়াত ৫-১৫) জাহান্নাম ও জান্নাতের কথা এসেছে; ৫ম অংশ (আয়াত ২৫-২৭) তে প্রকাশ করা হয়েছে যে মানুষ অবাধ্যতা বশত জানতে চায় যে তা কবে ঘটবে? ৩য় অংশ (আয়াত ১৬-২২) তে বলা হয়েছে হুমকি/বিপদ শীঘ্রই আসন্ন এবং তার প্রস্তুতির জন্য কতটুকু সময় প্রয়োজন? সেটা বলে হয়েছে পরের অংশে অর্থাৎ ৪র্থ অংশে (আয়াত ২৩-২৪)। এভাবে ৬ টি অংশ ধারাবাহিকভাবে যেমন সুন্দর ছন্দ ও যৌক্তিকতায় এগিয়েছে তেমনি এর প্রতিসমতার, ভারসাম্যতার মিলটাও অসাধারন। 

শুরুতে (৩য় আয়াতে) ২ বার দেখতে বলা হয়েছে। এরপর অনেক আয়াত পরে শেষের  দিকে (আয়াত ২৮ এবং ৩০) এসে মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে যে, আগে যে ২ বার বলা  হয়েছিল দেখতে সেটা দেখেছ তো? কি অসাধারন বর্ননাশৈলী!!!

রেফারেন্স ও কৃতজ্ঞতাঃ বিভিন্ন তাফসীর, বিশেষ করে Nouman Ali Khan এর তাফসীর, বিভিন্ন লেকচার, ভিডিও ইত্যাদি।



উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)